চট্টগ্রামে আইসিএমএবির সম্মেলনে বক্তারা

এফডিআই স্থবিরতা, কর ফাঁকি ও বন্দরের চাপ সামলাতে কাঠামোগত সংস্কার জরুরি

প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগে (এফডিআই) স্থবিরতা, রাজস্ব ঘাটতি ও কর ফাঁকির কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় চাপ তৈরি হয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ডিজিটাল কর ব্যবস্থা চালু, লজিস্টিকস ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা দ্রুত বৃদ্ধি করা জরুরি।

প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগে (এফডিআই) স্থবিরতা, রাজস্ব ঘাটতি ও কর ফাঁকির কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় চাপ তৈরি হয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ডিজিটাল কর ব্যবস্থা চালু, লজিস্টিকস ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা দ্রুত বৃদ্ধি করা জরুরি। এসব কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এলডিসি-উত্তরণ পর্বে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখা কঠিন।

চট্টগ্রামের একটি হোটেলে গতকাল ‘বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ: এফডিআই, আর্থিক সংস্কার ও এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন’ শীর্ষক সম্মেলনে বক্তারা এ কথা বলেন। দি ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএমএবি) চট্টগ্রাম ব্রাঞ্চ এ সম্মেলনের আয়োজন করে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়সংক্রান্ত বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ অর্থনীতির বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণে দুটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একটি বিদেশী প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) ও অন্যটি এলডিসি-পরবর্তী আর্থিক খাত সংস্কার। এই দুই ক্ষেত্র শক্তিশালী না হলে সামগ্রিক অর্থনীতি ঝুঁকির মধ্যে থাকবে। গত তিন বছর ডলারের হিসাবে জিডিপি স্থবির রয়েছে। রিজার্ভ, বিনিময় হার ও মুদ্রাস্ফীতি চাপ সৃষ্টি করেছে। বাজেট ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশ যাচ্ছে সুদ পরিশোধে, যা অভ্যন্তরীণ ঘাটতিকে আরো বাড়িয়ে তুলছে। একই সঙ্গে আমদানি-রফতানির ব্যবধানের কারণে বহিরাগত ঘাটতিও গভীর হয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় সঞ্চয় দিয়ে বিনিয়োগ চাহিদা পূরণ সম্ভব নয়। তাই এফডিআই গ্রহণ অপরিহার্য ও অবশ্যম্ভাবী। বিনিয়োগ বৃদ্ধি না পাওয়ার মূল বাধা হিসেবে লজিস্টিকস, অবকাঠামোগত অকার্যকারিতা ও দুর্নীতিকে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা উৎপাদন ব্যয় অপ্রয়োজনীয়ভাবে বাড়িয়ে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমিয়ে দেয়। এসব কাঠামোগত সমস্যার দ্রুত ও গভীর সংস্কার ছাড়া বিনিয়োগ আকর্ষণ সম্ভব নয়।’

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আব্দুর রহমান খান বলেন, ‘উন্নয়নের প্রথম শর্ত অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বৃদ্ধি। বাংলাদেশ বিশ্বের মধ্যে অন্যতম কম কর-জিডিপি অনুপাতের দেশ। তাই অযৌক্তিক করছাড় বন্ধে এখন থেকে এনবিআর বা সরকার নিজে কোনো করমুক্তি অনুমোদন করতে পারবে না, এটি করতে পারবে কেবল নির্বাচিত সংসদ।’

তিনি বলেন, ‘কর ফাঁকি, তথ্য গোপন ও জালিয়াতি রোধে সম্পূর্ণ কর ব্যবস্থাকে ডিজিটালাইজেশন করা হচ্ছে। আমদানি-রফতানির তথ্য, ব্যাংক হিসাব, সুদের আয়সহ সব ডাটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে এনবিআরের সিস্টেমে যুক্ত হবে। কোনো ভুল তথ্য দিলে রিটার্ন গ্রহণ করা হবে না। করপোরেট ট্যাক্স রিটার্ন ও আইসিএবির ডকুমেন্ট ভেরিফিকেশন সিস্টেমের সঙ্গে সংযুক্ত করা হবে।’

এনবিআর চেয়ারম্যান আরো বলেন, ‘অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সে জন্য আয় ও ব্যয় দুটোই বৃদ্ধি করতে হবে। আয়ের চেয়ে বেশি ব্যয় চলমান রাখলে দেশ ঋণের বোঝায় ডুবে যাবে। এছাড়া বহু রাজস্ব হারিয়ে যাচ্ছে ট্যাক্স লিকেজের মাধ্যমে। এটি বন্ধে এনবিআর ডিজিটাল সংযোগ বাস্তবায়ন করছে, আমদানি-রফতানির তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে রিটার্নের সঙ্গে মিলিয়ে দেখবে। ব্যাংক হিসাবের লেনদেন, সুদ ও আয়ের তথ্য গোপন করা যাবে না। সব রিটার্ন বাধ্যতামূলকভাবে অনলাইনে জমা হবে। করপোরেট রিটার্নের জন্য আইসিএবি ডকুমেন্ট ভেরিফিকেশন সিস্টেম যুক্ত হচ্ছে, ভুল তথ্য গ্রহণ করাই হবে না।’

সম্মেলনে চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এসএম মনিরুজ্জামান ভিডিও বার্তায় বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর দেশের আমদানি-রফতানির ৯২ শতাংশ পণ্য ও ৯৮ শতাংশ কনটেইনার পরিচালনা করে। দ্রুত বিশ্বায়ন ও কনটেইনারাইজেশনের ফলে বড় জাহাজ, বাড়তি কার্গো এবং ডিজিটাল ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখা এখন জরুরি।’

তিনি জানান, বর্তমানে এ বন্দর প্রতি বছর ৩ দশমিক ৩ মিলিয়ন টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিং করছে। প্রবৃদ্ধি ১১ শতাংশ হলে ২০৩০ সালে সাড়ে ৫ মিলিয়ন ও ২০৩৫ সালে সাড়ে ৭ মিলিয়ন টিইইউস সামলাতে হবে। এজন্য সক্ষমতা বৃদ্ধি, দক্ষতা উন্নয়ন ও গ্লোবাল প্র্যাকটিস অপরিহার্য।

আইসিএমএবির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আনিসুজ্জামানের সভাপতিত্বে সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সেভেন রিংস সিমেন্টের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (সিএফও) মো. কাউসার আলম। টেকনিক্যাল পেপার উপস্থাপন করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক ড. এসএম সোহরাব উদ্দিন।

আরও